থ্যালাসেমিয়া ন্যাশনাল ইস্যু সৃষ্টিতে BRF এর রিসার্চ ইফোর্ট কী ভাবে পার্ট হলো?

Posted on: February 18, 2018, by :

সিঙ্গাপুর ১০+ বছর রিসার্চ লাইফ কাটিয়ে দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করি। যেহেতু সিংগাপুরের ল্যাব রিলেটেড স্কিল দেশে এপ্লাই করার স্কোপ নেই, তাই শুরু থেকে পাবলিক হেলথ ফিল্ডে ফোকাস করি। দেশের হেলথ সেক্টর অজানা, অপরিচিত ছিল। ইমেলে randomly যোগাযোগ করে বারডেমের ড তানভীরা সুলতানা (Tanvira Afroze Sultana) আপার সাথে যোগাযোগ হয়। আমরা দুজনে ব্লাড ক্যান্সার নিয়ে কাজ করি। ডাটা এনালাইসিস করতে গিয়ে দেখা গেল এনাফ ডাটা নেই। অন্য কোন প্রতিষ্ঠানকে জড়িত করা যায় কিনা তা তানভীরা আপাকে জানালাম। তিনি হেমালোজিস্টদের একটি মিটিং এ নিয়ে গেলেন। সেই মিটিং-এ প্রফেসর মনজুর মোরশেদ স্যারের সাথে পরিচয় হলো। অবশেষে ব্লাড ক্যান্সার সংক্রান্ত ৫০০০ কেইস এনালাইসিস করে প্রথম পাবলিকেশন হলো যেখানে ১৪টি প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল! তখনও থ্যালাসেমিয়ার সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তানভীরা আপা মাঝে মাঝে থালাসেমিয়া ইস্যু নিয়ে আপসোস করতেন। কিন্তু আমি এটির সিরিয়াসনেস সম্পর্কে জানতাম না।

আমাদের ব্লাড ক্যান্সার পেপারটি পাবলিশ হওয়ার পর নেটওয়ার্ক বেড়ে গেল। প্রফেসর মোরশেদ স্যার এবং কিছু হেমাটোলজিস্ট মিলে একটি গ্রুপ বানালেন যেখানে আমাকে সায়েন্টিফিক পার্ট ডিল করার দায়িত্ব দেন। দুটি মিটিং হওয়ার পর সেটি বন্ধ হয়ে গেল। সেই মিটিং-এ ডা রবিন (থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতার সাথে পরিচয় হলো। প্রফেসর মোরশেদ স্যার একদিন ফোন করে বললেন- তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো। গিয়ে দেখলাম সেটি থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতাল। রোগীদের দেখে ভীষন খারাপ লাগল। পরে চিন্তা করলাম এটি নিয়ে রিসার্চ করে ইস্যু বানাতে যায় কিনা। এটি ২০১৪ সালের কথা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চে ইফোর্ট দেয়ার কারনে মানসিক যাতনা বেড়ে গেল। এই সময় ইনসেপ্টা যোগাযোগ করে। আমি এপ্লাই করিনি। অনেক ভেবে চিন্তা আশা নিয়ে ইনসেপ্টায় জয়েন করলাম। সেখানে কাজ শুরু করার আগে টিপিক্যাল রিসার্চ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ইন্ডাস্ট্রি-বিশ্ববিদ্যালয় কলাবোরেটিভ কালচার গড়ে তোলার বাসনা নিয়ে লাইফের একটি বড় সিদ্ধান্ত নিলাম। অত্যন্ত মন দিয়ে কাজ করছিলাম। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে শুরু করা কাজটি বাদ দিয়েছিলাম। একজন চিকিতসক এবং অস্ট্রেলিয়া ফেরত বন্ধুকে রিকুয়েস্ট করলাম এটি নিয়ে কম্প্রিহেনসিভ পেপার লিখতে। তারা কেউ রাজী হলো না। এর মাঝে প্রফেসর মোরশেদ স্যার বাসায় এসে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে বুঝালেন। পেপারটি যাতে লেখি এজন্য অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা করলেন।

ইন্ড্রাস্ট্রিতে হানিমুন পিরিয়ড শেষ হলো। সেখানে এত পলিটিক্স তা অজানা ছিল। একমাত্র ভরসা ছিল হেকেপ প্রজেক্ট। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেপ্টার পক্ষ থেকে তিন প্রজেক্ট জমা দিলাম। শুধু প্রার্থনা করতে থাকলাম একটি হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ড্রাস্ট্রির মধ্যে একটি যোগসূত্র তৈরী হবে। বড় বড় স্বপ্ন দেখতাম। আমার ডিপার্টমেন্টের এমপ্লয়িরা জবের পাশাপাশি পিএইচডি ডিগ্রী নিতে পারবে। অবশেষে একটি এক মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট আমরা জিতলাম। সম্ভবত আল্লাহর ইচ্ছায় এই রিসার্চ গ্রান্টকে কেন্দ্র করেই আমাকে ইনসেপ্টা থেকে রিজাইন দিতে হলো। ১০ মাস কোন ফরমাল জব ছিল না।

যখন বুঝলাম ইন্ড্রাস্ট্রি আমার আসল জায়গা নয় তখন থেকে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলাম। জব থেকে রিজাইন দিয়েই প্রথম টার্গেট ছিল থ্যালাসেমিয়াকে জাতীয় ইস্যুত বানাতে পেপার লেখা। এত পড়াশুনা করেছি তা বলে বুঝানো যাবে না। দেশে ফিরেই একটি নিউট্রাল রিসার্চ গ্রুপ বানাতে অনেকের কাছে গিয়েছিলাম। এক সময় মনে হয় বাংলাদেশে যেখানেই কাজ করি না কেন সমস্যা হবে। তাই রিসার্চ যেন কণ্টিনিউ থাকে তার জন্যে এমন একটি রিসার্চ প্লাটফর্ম বানানো যেখানে দেশ-বিদেশের আগ্রহীরা রিসার্চাররা কলাবোরেটিভ কাজ করতে পারেন। ডাটা এনালাইসিসের ক্লিল বুড়ো বয়সে অর্জন করতে গিয়ে দেখলাম এটি আমার জন্য কঠিন। তাছাড়া সময়ের অপচয়। এই স্কিল সম্পন্ন একজন রিসার্চার আমার পার্টনার হলেই তো প্রবলেম সলভ। অনেক খোজাখুজি করে আমেরিকার প্রবাসী ড এনায়েতুর রহিমকে (Enayetur Raheem) আল্লাহ মিলিয়ে দিলেন। তিনি আমার সব রিসার্চ উদ্যোগের অর্ধেক পার্ট বলা যায়।
জব ছাড়া ১০ মাস খুবই প্রডাক্টিভ ছিল।

এসময় অনেকদিনের লালিত স্বপ্ন কলাবোরেটিভ রিসার্চ প্লাটফর্ম অফিসিয়াল রূপ দিতে আল্লাহ সাহায্য করলেন। আমরা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে মিশন-ভিশন ঠিক করলাম। বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউণ্ডেশন (Biomedical Research Foundation) অফিসিয়াল রূপ লাভ করল। এই সময় আয়াল্যান্ড প্রবাসী ড আব্দুর রাজ্জাক রাজ (Mohammad A. Razzaque Raz) ভাই এগিয়ে আসলেন। তিনি ওয়েবসাইট বানানোর দায়িত্ব নিলেন। বিআরএফ থেকে আমরা থ্যালাসেমিয়াকেই প্রাইরিটি দিলাম। অনেক পরিশ্রম করে পেপার প্রস্তুত করছিলাম। এসময়টাইতে সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আব্বা ইন্তেকাল করলেন। মানসিকভাবে বিপর্যন্ত হলাম। জানাজা শেষ করে শোককে শক্তিতে পরিনত করতে থ্যালাসেমিয়ার পেপারটি কমপ্লিট করতে ঝাপিয়ে পড়লাম। ম্যানুস্ক্রিপ্ট সাবমিট করার আব্বার কথা স্মরণ হলে চোখের অঝোর ধারা বন্ধ করতে পারছিলাম না। মাত্র মাস খানিকের মধ্যেই পেপার এক্সেপ্ট হলো।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়ার হটস্পট হওয়ার সত্ত্বেও বড় লেভেলের পাবলিকেশন ছিল না। থ্যালাসেমিয়ার ভুক্তভোগী প্যারান্টরা মিলে ১৯৮৪ সালে থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল বানালেন। জামালপুরে মুকুল আপার থ্যালাসেমিয়া ধরা পরার পর এটি টক অব দ্যা টাউন ছিল। সেটি ছিল ৮০’র দশকের কথা। ১৯৯১ সালে জিওগ্রাফী পড়ুয়া সেই মুকুল আপার (Kamrun Nahar) থ্যালাসেমিয়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে Concert for Mukul অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল খুবই ব্যতিক্রম ধর্মী উদ্যোগ যা থ্যালাসেমিয়ার সচেতনতায় ভূমিকা রেখেছিল। হেমাটলজিস্টরাও অনেক রোগী হ্যান্ডেল করতে করতে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। এই প্রক্ষাপটে আমাদের পেপারটি থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সরকারী লেভেলে সিস্টেমেটিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডেনটিস্টির শিক্ষক ডা মাহফুজুর রহমান রাজ (Mahfuzur Rahman Raj) ভাই ফেসবুকে থালাসেমিয়া নিয়ে একটি পোষ্ট দেন। আমাদের পেপার পাবলিশ হওয়ার পর আমরাও ফেসবুকে সচেতনতা সৃষ্টিতে পোষ্ট দিতাম। সেখান থেকে হয়ত ডা মাহফুজ ভাই আমাকে জানেন। পরবর্তীতে উনার পোষ্টে আলোচনা করতে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি আরো হেমাটোলজিস্টকে একই আলোচনায় আনেন। ফেসবুকে চ্যাটগ্রুপে আমরা তুমুল আলোচনা করেছি। ফেসবুক পোষ্টেও হিউজ আলোচনা করেছি। অবশেষে হেলথের সচীব সিরাজুল ইসলাম খান সাহেব আলোচনায় অংশগ্রহন করেন। হেলথের ডিজি প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ ঘোষনা করেন রমাদানের মধ্যেই তিনি এটি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চান। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারনে প্রথম মিটিং-এ যেতে পারিনি। সেই মিটিং-এ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের থ্যালাসেমিয়া পেপারটিকে সবাইকে দেয়া হয়েছে। এরপর ন্যাশনাল কমিটিও নাকি হয়েছে। কিছুদিন স্থবির থাকার পর গতকাল ১০ জানুয়ারীতে জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। সরকারের পক্ষ থেকে সবার ফোনে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা নিয়ে এসএমএসও করা হয় জানুয়ারীর ৯ তারিখে।

অনেকের প্রচেষ্টার ফলে আজকে এ অবস্থায় এসেছে। রিসার্চের মাধ্যমে যে মানুষের অবস্থার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে অনেকের ধারনার বাইরে। সেদিক দিয়ে BRF প্লাটফর্ম থেকে প্রথম পেপার থ্যালাসেমিয়াকে জাতীয় ইস্যুত বানাতে ভূমিকা রেখেছে। আলহামদুলিল্লাহ। কাজ মাত্র শুরু হলো। অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশে সম্ভবত প্রায় এক কোটি ৬০ লক্ষ থ্যালাসেমিয়ার কেরিয়ার রয়েছে। প্রতিরোধ না করা গেলে দিন দিন শুধু বাড়তেই থাকবে। BRF থেকে আমরা থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ নিয়ে দুটি কম্প্রিহেনসিভ ইণ্টারভেনশনমূলক রিসার্চ মডেল (কমিউনিটি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক) প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছি। আমাদের এই উদ্যোগ একা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আমরা আমাদের পার্টনার হিসেবে ৩০ বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সমিতি হাসপাতালকে (Bangladesh Thalassemia Samity Hospital) পাশে পেয়েছি। আমাদের টিমে বেশ কয়েকজন হেমাটলজিস্টও রয়েছেন। সবমিলে প্রায় ৫০+ জনের মত টিম, দেশ-বিদেশ মিলে ২৫ জনের মত মাল্টিডিসিপ্লিনারি ফিল্ডে ডিগ্রীধারী এবং ২০+ ক্লিনিসিয়ান রিসার্চ রয়েছেন। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিআরএফ নিউট্রাল প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। আমরা এই ফিল্ডের সবাইকে একত্রিত করতে চেষ্টা করছি।

সবাই মিলে কাজ না করলে দেশের বড় সমস্যা সমাধান করা যায় না। আমরা একসময় থাকব না কিন্তু আমাদের ভাল উদ্যোগগুলো থেকে যাবে। ছোট-খাটো বিষয়গুলোকে ইগনোর করে আসুন আমরা থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে কলাবোরেটিভ উদোগের মাধ্যমে কাজ করে দেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করি।

1 thought on “থ্যালাসেমিয়া ন্যাশনাল ইস্যু সৃষ্টিতে BRF এর রিসার্চ ইফোর্ট কী ভাবে পার্ট হলো?

  1. Assalamualikum sir. Very inspirational story. Take some initiative for research on the dengue outbreak. Is there any scope for aspirant newcomers in your team?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *